আকাশের বুক চিরে তখনো সূর্যের উদয় ঘটেনি। মদিনার অনুকরণে তৈরি শহরের এই
বিশাল মসজিদটির মিনার থেকে সুমধুর আজান ভেসে আসছিল। 'হাইয়া আলাল ফালাহ'—কল্যাণের দিকে এসো। কিন্তু সাফওয়ানের কানে সেই শব্দগুলো আজ
সীসার মতো ভারী ঠেকছে। সে তার শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত স্টুডিওর রিভলভিং চেয়ারে বসে আছে।
সামনে দামী সব অডিও ইকুইপমেন্ট, মনিটরে তরঙ্গের মতো খেলে যাচ্ছে তার নতুন নাশিদের বিট।
সাফওয়ান, যার কণ্ঠ শুনলে হাজারো তরুণী দীর্ঘশ্বাস ফেলে, যার একেকটি
ভিডিওর নিচে কমেন্ট বক্সে উপচে পড়ে প্রশংসা আর মুগ্ধতা, সেই সাফওয়ান
আজ নিজের ভেতরে এক অদ্ভুত পঙ্গুত্ব অনুভব করছে। তার কণ্ঠটি আগের মতোই আছে—মখমলের
মতো মসৃণ, কিন্তু সেই কণ্ঠে যে রুহ বা আধ্যাত্মিকতা থাকার কথা ছিল, তা যেন গত
কয়েক মাসে বাষ্প হয়ে উড়ে গেছে।
স্টুডিওর নিস্তব্ধতা এবং একটি কম্পন
স্টুডিওর নীলচে আলোয় তার চেহারাটা ফ্যাকাসে দেখাচ্ছে। টেবিলের ওপর রাখা
দামী স্মার্টফোনটি হঠাৎ কেঁপে উঠল। ভাইব্রেশনের সেই মৃদু শব্দটা এই নিস্তব্ধ ঘরে
যেন বজ্রপাতের মতো শোনাল। সাফওয়ান একবার ফোনের দিকে তাকাল, পরক্ষণেই চোখ
সরিয়ে নিল। সে জানে ওপাশে কে। সে জানে এই অসময়ে কার টেক্সট আসার কথা।
তার মনে পড়ল ইমাম গাজ্জালির সেই বিখ্যাত উক্তি—"কলব বা হৃদয় হলো একটি আয়নার মতো। একটি গুনাহ সেই আয়নায় একটি কালো দাগ
ফেলে দেয়।" সাফওয়ান নিজের মনের আয়নায় তাকিয়ে আজ নিজেকেই চিনতে পারছে
না। সে কি সেই মানুষটি, যে গত বছর হজের ময়দানে ধুলোবালি মাখা শরীরে আল্লাহর দরবারে
অঝোরে কেঁদেছিল? নাকি সে এখন সেই মানুষ, যে কি না রাতের অন্ধকারে পরনারীর
সাথে শব্দের জাল বুনতে ব্যস্ত?
বাইরে তখন হালকা কুয়াশা। জানালার কাঁচের ওপারে প্রকৃতি যেন এক ধ্যানে
মগ্ন। পাখিদের কিচিরমিচির শুরু হয়েছে,
যা কি না তাসবিহ পাঠের মতো শোনায়। কিন্তু
সাফওয়ানের স্টুডিওর এই কৃত্রিম পরিবেশ তাকে এক দমবন্ধ করা অনুভূতির দিকে ঠেলে
দিচ্ছে। এই ঘরটি শব্দহীন করার জন্য তৈরি (Soundproof),
কিন্তু তার ভেতরের হাহাকার এই দেয়ালগুলো
আটকে রাখতে পারছে না।
মরিয়মের জায়নামাজ ও নীরব দূরত্ব
সাফওয়ান স্টুডিও থেকে বেরিয়ে ধীরপায়ে শোবার ঘরের দিকে এগোল। দরজাটা
সামান্য ফাঁক করা। ভেতরে ভোরের সেই পবিত্র আলোটা খেলা করছে। সে দেখল, মরিয়ম
জায়নামাজে বসে আছে। তার মাথায় সাদা হিজাব,
দুহাত তুলে সে মোনাজাত করছে। মরিয়মের এই
রূপটি সাফওয়ানের কাছে এক সময় পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য ছিল। কিন্তু আজ কেন যেন
সে মরিয়মের সামনে যেতে ভয় পাচ্ছে।
মরিয়মের মোনাজাতের অস্পষ্ট শব্দগুলো তার কানে আসছে—"হে আল্লাহ, আমার পরিবারকে তোমার হেফাজতে রেখো। আমার স্বামীর কপালে
নূরের ছোঁয়া দাও।" সাফওয়ানের বুকটা এক তীব্র যন্ত্রণায় মুচড়ে উঠল। সে নিজেকে
এক বিশাল প্রবঞ্চক মনে করল। যে নারী তার জন্য সারা রাত জেগে দোয়া করছে, সেই নারীর
বিশ্বাসকে সে তিল তিল করে হত্যা করছে। সাফওয়ান বুঝল, পরকিয়া আসলে কোনো শারীরিক বিষয় নয়, এটি হৃদয়ের এক
জটিল ক্যান্সার। এটি প্রথমে মানুষের ইমানকে খেয়ে ফেলে, তারপর তার
বিবেককে অন্ধ করে দেয়।
সাফওয়ান দরজার পাশেই দাঁড়িয়ে রইল। সে ঘরে ঢোকার সাহস পেল না। তার মনে
হলো, সে যদি এখন মরিয়মের পবিত্র সান্নিধ্যে যায়, তবে তার
শরীরের অপবিত্রতা হয়তো এই ঘরের নূরকে কলঙ্কিত করে দেবে।
একটি স্মৃতি এবং পতন
সে ফিরে গেল তিন মাস আগের এক দিনে। একটি চ্যারিটি প্রোগ্রামে তার সাথে
প্রথম দেখা হয়েছিল সেই নারীর। নাম তার সাহেলা। নামি এক ব্যক্তিত্বের স্ত্রী।
প্রথমে আলাপ হয়েছিল 'ইসলামিক আর্ট'
নিয়ে। তারপর ধীরে ধীরে তা মোড় নিল
ব্যক্তিগত কষ্টের গল্পে। সাফওয়ান নিজেকে বোঝাল, সে তো কেবল একজন বিপদগ্রস্ত বোনকে
সান্ত্বনা দিচ্ছে। কিন্তু শয়তান তার জালে কীভাবে যে 'সহানুভূতি'র আবরণে 'আসক্তি' ঢুকিয়ে দিল, সাফওয়ান টেরও
পেল না।
এখন অবস্থা এমন যে, সাফওয়ানের নাশিদের প্রতিটি সুরের আড়ালে সাহেলার হাসির
প্রতিধ্বনি থাকে। সে যখন আল্লাহকে নিয়ে গায়,
তার অবচেতন মন তখন সাহেলার ইনবক্সের নীল
বাতির দিকে চেয়ে থাকে। এটিই কি সেই পথভ্রষ্টতা, যার কথা যুগে যুগে ওলি-আউলিয়ারা
সতর্ক করে গেছেন?
প্রকৃতির প্রতিবাদ
সাফওয়ান বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। ভোরের বাতাস বইছে। এই বাতাস বড় পবিত্র।
এটি মানুষের ক্লান্তি ধুয়ে দেয়। কিন্তু সাফওয়ানের মনে হচ্ছে, বাতাস তাকে
বিদ্রূপ করছে। গাছের পাতারা যখন নড়ছে,
সাফওয়ানের মনে হচ্ছে তারা যেন আঙুল
উঁচিয়ে তাকে বলছে—"ওহে নাশিদ শিল্পী, তোমার সুর কি কেবল মানুষের কানের
জন্য? তোমার রবের জন্য কি তোমার কাছে কোনো সুর অবশিষ্ট নেই?"
দূরে দিগন্তে লালিমা ফুটে উঠছে। দিন শুরু হচ্ছে। পৃথিবীর মানুষ জেগে
উঠবে। সাফওয়ানকে আবার তার সেই 'সেলিব্রেটি' মুখোশটা পরে নিতে হবে। তাকে ক্যামেরার সামনে হাসতে হবে, দরদ দিয়ে
গাইতে হবে, ভক্তদের আধ্যাত্মিক নসিহত দিতে হবে। কিন্তু তার ভেতরের মানুষটি তখন মৃত
পড়ে থাকবে।
সে তার ফোনের লক স্ক্রিনটা খুলল। দেখল একটি নতুন মেসেজঃ "শুভ সকাল। আপনার নাশিদের সেই লাইনটা কাল সারা রাত কানে
বেজেছে... 'তুমি ছাড়া আমায় আর কেউ বোঝে না।' আসলে
কথাটি আমার জন্যই সত্য।"
সাফওয়ান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এই নীল পদ্মটির সৌন্দর্য তাকে মুগ্ধ
করছে ঠিকই, কিন্তু এর ভেতরের নীল বিষ যে তার পুরো সংসারকে নীল করে দিচ্ছে, তা সে দেখেও
দেখছে না। তার মনে হলো সে এক বিশাল অতল গহ্বরের কিনারায় দাঁড়িয়ে আছে। এক কদম
এগোলেই ধ্বংস, আর পিছু হটার শক্তি সে হারিয়ে ফেলেছে।
আজানের শেষ প্রতিধ্বনি তখনো বাতাসে ভাসছে। সাফওয়ান বিড়বিড় করে বলল, "হে আল্লাহ, আমি কি ফিরতে পারব? নাকি আমার এই পতনই আমার শেষ পরিণতি?" আকাশের মেঘেরা কোনো উত্তর দিল না। শুধু একঝাঁক পাখি উড়ে গেল পশ্চিম থেকে পুবে, যেন তারা কোনো এক অজানার সন্ধানে চলে যাচ্ছে, ঠিক যেমন সাফওয়ানের শান্তি আজ তাকে ছেড়ে অজানায় পাড়ি জমিয়েছে।
["কল্পনার তুলিতে আঁকা এই কাহিনীর প্রতিটি চরিত্র ও ঘটনা একান্তই কাল্পনিক। ইতিহাসের কোনো পাতা বা বাস্তবের কোনো মানুষের ছায়ার সাথে এর কোনো যোগসূত্র নেই। কোনো মিল পাওয়া গেলে তা লেখকের অনিচ্ছাকৃত এবং নিছক কাকতালীয় ঘটনা মাত্র।"]


আপনার মূল্যবান মতামত দিন। আমরা আপনার কমেন্টের অপেক্ষায় আছি! দয়া করে গঠনমূলক মন্তব্য করুন এবং কোনো স্প্যাম বা বিজ্ঞাপন লিংক শেয়ার করবেন না।